গৌরনদী বন্দরের ইতিহাস

বৃহতি গৌরনদী বলতে ১২ টি ইউনিয়ন বোঝালে ও  গৌরনদীর নির্দীষ্ট স্থান বাচক নামটির সাথে সংশ্লিষ্ট  অঞ্চলেই  গৌরনদী বন্দর অবস্থিত। অতএব , এ বন্দরটি সম্পর্কে  কিছু কথা না বললেই নয় । তাই গৌরনদী বন্দরের আদিকথা দিয়ে শুরু করা যাক।

অনুমান করা যায়   প্রায় ৫০০ বছর পূর্বে গৌরনদী বন্দরের জন্ম। ১৮০০ সালের পূর্বে হিন্দু জমিদার ও ব্যবসায়ীদের  মাধ্যমে বন্দরটি পরিচালনা হয়ে আসছিলো  । আনুমানিক ২০০ বছর পূর্বে  থেকে মুসলমানদের আবির্ভাব ঘটে । তৎকালীন সময়ে বাবু মোহন, লাল সাহা, বাবু যোগেন্দ্র নাথ ডাক্তার, বাবু নারায়ন চন্দ্র পোদ্দার, বাবু কেশব চন্দ্র রায়, বাবু লক্ষণ চন্দ্র দাস, বাবু মদন মোহন রায়, বাবু রাখালচন্দ্র রায়, বাবু সুধীর চন্দ্র বনিক, বাবু রাখাল চন্দ্র বণিক, বাবু অমুল্য চন্দ্র সাহা এবং মুসলমানদের মধ্যে মফিজুদ্দিন মৃধা। মূলতঃ বাজারের স্থায়ী ভিটির মালিক চারটি গোত্র সংযুক্ত ছিল। কুন্ড ।. বণিক ।.,  সাহা ।., এবং রায়-দত্ত ।., আনা মালিক বিদ্যমান ছিল । এদের ফাঁকে ঘোষ, দাস, দে, দেবনাথ সহ কিছু মুসলমান  স্বাধীনতার পূর্ব থেকে ১ নং  পথের সম্বল বিড়িমালিকানা লাভ করে। উক্ত সম্বল বিড়ি রাজেন্দ্র দাস ও ১০১ নং পথের সাথী বিড়ির মালিক উপেন দাসের বন্দরে বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ছিল। স্বাধীনতার পর ১ নং সম্বল ও ১০১ নং পথের সাথী বিড়ি নানা জটীলতায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সমবায় শ্রমিক বিড়ি ২৯৯ জন সদস্যের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে- আসছে।তৎকালীন সময়ে গৌরনদী বন্দরের সুতা, পাট, ধান ও ভুষামাল ক্রয়ের জন্য বিশাল আড়ৎ ছিল। বন্দর বিশাল মুদী দোকান ও ছিল। এখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে খরিদ্দাররা আসত  পাইকারী কেনাকাটা করতে । এসব দোকান মালিকদের মধ্যে ঋষিকেশ বণিক, জব্বার চৌকিদার, সোনাই পোদ্দার গৌরনদী বন্দরের উৎকৃ্ষট মানের মিষ্টির দোকান ছিল । ভুবন মোহন ঘোষ, যদু ঘোষ, অনীল ঘোষ, আমজেদ আলী সরদার, অনন্ত ঘোষ, গেদু ঘোষ ।কিন্তু শচীন ঘোষ, শুশীল ঘোষ ও জগদীশ ঘোষ এর মিষ্টি পেসিদ্ধ হয়ে আছে। দেশ বিদেশে এখানকার ঘি, দৈ, মিষ্টি ক্রয় বিক্রয় হয়ে থাকে। রাখী মালের মহাজন হিসেবে আমীর লতিফ, মেছের হাওলাদার, আক্কাছ হাওলাদার, হরিপদ রায়, দুলাল কর্মকার, জলিল তালুকদার, এমদাদ মাষ্টার এরা উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়ী ছিলেন। গৌরনদী বন্দরের ঐতিহ্য ১লা বৈশাখে ১ দিনের মেলা  উৎসবে নৌকা রাইচ প্রতিযোগিতা, নাচ- গানের আসর অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কাঠ, বেত, বাশের সরঞ্জম আসে। এছারা হিন্দুদের ঐতিহ্যবাহী দূর্গা পূজার দশমীতে দশোহরার মেলা উল্লেখ্যযোগ্য।

গৌরনদী বন্দরের আদি নাম পালরদী বাজার। অর্থাৎ এ মৌজার নাম দক্ষীণ পালরদী। পাশে মৌজা চরগাদাতলী, তিখাসার, পাশে আড়িয়াল খার শাখা নদী অবস্থিত । ৫০০ গজ পূর্বে নদীর পূর্ব পাড় মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার রমজানপুর ইউনিয়নের চর পালরদী গ্রাম অবস্থিত। পূর্বে এ নদী দিয়ে স্টিমার চলত। যে কারনে ভারত থেকে মালামাল আনা-নেয়া করা হত। বাজারটি দুই অংশে বিভিক্ত। মধ্য  দিয়ে একটা খাল , যা আড়িয়াল নদী থেকে ঝালকাঠি হয়ে দক্ষিণ সাগরে গিয়ে মিশেছে । যে কারনে পূর্ব থেকেই ব্যবসায়ীগণ ঝালকাঠি থেকে মালামাল ক্রয় করে গৌরনদী বন্দর ও টরকী বন্দরে আনা নেয়া করত। এছাড়া ও এ খাল দিয়ে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে খুলনা, মংলা,বাগেরহাট, পিরোজপুর, হুলার হাট, স্বরূপকাঠী থেকে মালামাল নৌকা ও ইঞ্জিন নৌকায় সুন্দরী কাঠ সহ অন্যান্য মালামাল চাঁদপুর সহ ঢাকা, নারায়নগঞ্জে যা যাতায়াত করায় গৌরনদী বন্দরের ঐতিহ্য আর ও অনেক বেশী হয়েছে । ঢাকা, নারায়নগঞ্জ থেকে প্রতিদিন ২টি বড় লঞ্চ গৌরনদীস্থ টরকী বন্দর পর্যন্ত চলাচল করে। টরকী গৌরনদী থেকে প্রতিদিন ৪/৫ শত যাত্রী বহন করে রাজধানী ও মহানগর লঞ্চ ঢাকার উদ্দেশ্য চলে যায় ।

এছাড়া গৌরনদী বাস স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন দেশের লক্ষিণাঞ্চলে সহ রাজধানী ঢাকা ও বিভাগীয় শহর খুলনা, যশোর, ঝিনাইদহ সহ পশ্চমাঞ্চলের অনেক যাত্রী যাতায়াত করা সত্তে ও গৌরনদী বন্দরের ঐতিহ্য কোন অংশেই ম্লান হয়নি ।

আদি বন্দর সংলগ্ন গৌরনদী  থানা, জনগণের নিরাপত্তা ও চার থানার নিরাপত্তার দায়িত্ব প্রাপ্ত সার্কেল অফিসারের কার্যালয় (বন্দর ও বাসস্ট্যান্ডের মধ্যবর্তী  স্থানে) , রয়েছে তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক যথা- বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক , অগ্রণী ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক , অসংখ্য এনজিও কার্যালয়,মোবাইল ফোন টাওয়ার (গ্রামীণ ফোন, সিটিসেল, বাংলালিংক, একটেল) ও যুবক ফোন, অস্নগখ্য বীমা কার্যালয় বন্দরে অবস্থিত ।

১৯৯৬ সাল থেকে গৌরনদী  বন্দর সংলগ্ন আর ও একটা মাত্রা যুক্ত হয়েছে- গৌরনদী  পৌরসভা, বর্তমানে যা বি গ্রেডভূক্ত। বন্দরের ঐতিহ্য গৌরনদী  সাবরেজিষ্ট্রি অফিস ও সংলগ্ন খাদ্য গুদাম এবং থানা সংলগ্ন মসজিদ ও এতিমখানা।  গৌরনদী বন্দরের মাঝখানে রয়েছে পুরনো শ্রী দূর্গা মন্দির ও শ্রী শ্রী হরি মন্দির। গৌরনদী বন্দরের মসজিদের দু’টোরদাতা ও প্রতিষ্ঠাতা হলেন মেছের আলী খান পঞ্চায়েত এবং হযরত মাওলানা মোঃ আবুল কাসেম (র) ।

নলচিড়া ইউনিয়নের ও গৌরনদী উপজেলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ৪ বার স্বর্ণপদক প্রপ্ত গৌরনদী বন্দরের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ী সংসদের সভাপতি মরহুম গোলাম মালেক মৃধার পরিবার, তার পিতা ছিলেন মরহহুম মফিজুদ্দিন মৃধা, যিনি একাধারে নলচিড়া ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট এবং দীর্ঘদিন গৌরনদী ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ছিলেন। এম, এ আজিজ ভিপি, দরবেশ আঃ আজিজ কারী, রবি সংকর রায়, আব্দুর রাযযাক খান প্রমুখ গৌরনদী  বন্দরে স্থায়ী ভাবে বসবাস করেন ।

বর্তমানে গৌরনদী  বন্দরে ৪/৫ টি অত্যাধুনিক মার্কেট নির্মিত হয়েছীবং এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মফিজুদ্দিন মার্কেট, সমবায় শ্রমিক বিড়ি মার্কেট, বাবু সুপার মার্কেট, সাবরেজিষ্ট্রি মসজিদ মার্কেট, আলাউদ্দিন সুপার মার্কেট, কাজী সুপার মার্কেট , লঞ্চঘাট সুপার মার্কেট  ইত্যাদি। এছাড়া প্রতি মংগল বার এখানে বাজারের পাশাপাশি সূতা, গামছা ও মশারীর হাট বসে ।

প্রতিদিন পাইকারী হিসেবে বিখ্যাত কাটা কাপড় ও শাড়ী কাপড়ের জমজমাট আড়ৎ যাতে বরিশাল , কোটালিপাড়া, আগৈ্লঝাড়া সহ পার্শবর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকারগন কেনাকাটা করতে আসেন। এছাড়াও আছে লেপ, তোষক তৈ্রির জনপ্রিয় দোকান এবং উন্নত মানের স্বর্ণালংকার  দোকান আছে ।  পাইকারী মছের আড়ৎ্ এর মাছ  ঢাকা শহর সহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পাঠানো হয়।

বর্তমানে যে সব ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান সুনাম ছড়িয়েছে তার মধ্যে গৌ্র নিতাই মিষ্টান্ন ভান্ডার, প্রোঃ বাবু শচীন ঘোষ, শ্রী গুরু মিষ্টান্ন, ভান্ডার, প্রোঃ বাবু বল্রাম ঘোষ, সাহা বস্ত্র বিতান,প্রোঃ বাবু নিখিল সাহাঃভাই ভাই বস্ত্র বিতান, প্রোঃ বাবু ভোলানাথ সাহাঃ রতন ক্লথ স্টোর, প্রোঃবাবু গোবিন্দ কুন্ড, তাকওয়া ডিপার্ট্মেন্টাল স্টোর, প্রোঃজনাব জানে আলম বাদল ও  সৈয়েদ বস্ত্র বিতান, প্রোঃ মরহুম পীরজাদা  সৈয়েদ  শাহজাহান ।