শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক ইতিহাস ও ঐতিহ্য সমৃদ্ধ এক জনপদ আগৈলঝাড়া

এস এম শামীম, আগৈলঝাড়া

বরিশাল জেলার উত্তরে সর্বশেষ উপজেলা প্রচীন জনপদ আগৈলঝাড়া। আগৈলঝাড়া উপজেলার পশ্চিমে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলা, উত্তরে মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলা এবং পূর্বে বরিশালের শেষ উপজেলা গৌরনদী ও দক্ষিণে বরিশালের উজিরপুর উপজেলা অবস্থিত। বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়া থানাটি ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। সুলতান আমলে শাসক ছবিখাঁর নামে ও অর্থায়নে খননকৃত দীঘির আগৈল (মাটি বহনকারী বাশেঁরপাত্র) ধোয়ারস্থান হিসেবে আগৈলঝাড়ার নামকরন করা হয় মর্মে জনশ্রুতি রয়েছে।

প্রচীন নিদর্শন কবি, সাহিত্যিক, জ্ঞানী-গুনিজনদের জন্মভূমি আগৈলঝাড়া উপজেলা হিসেবে সত্যিই অনন্য। শিল্প, সাহিত্য, সাংস্কৃতি, কৃষি উৎপাদন বিপননে বাংলাদেশ ছাড়াও বিদেশেও রয়েছে আগৈলঝাড়ার সুনাম। ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষা আন্দোলন, ৬৯ সালে গন-আন্দোলন, ৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্দোলন সহ জাতীয় প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে আগৈলঝাড়ার মানুষ গুরুত্ব পূর্ন ভূমিকা রেখে চলেছে। আগৈলঝাড়া উজেলায় একে একে বিলুপ্ত হয়ে গেছে প্রাচীন জমিদার বাড়ি গুলো এমন যে ২-১ টি বাড়ীর স্মৃতি চিহ্ন আছে তাও ধ্বংসের পথে। জমিদারদের ফেলে যাওয়া অধিকাংশ বাড়িই মালিক বিহীন থাকায় যতœ নেয়ার কেউ ছিলনা। ২-১টি বাড়িতে বংশধররা থাকলেও তারা সংস্কারের উদ্যোগ নেয়নি। আগৈলঝাড়া উপজেলার ঐতিহ্য গৈলা এলাকার জমিদার ছিলেন, নলচিড়ার কুতুব শাহ। পলাশী যুদ্ধের পর হিন্দু কর্মচারীদের খাজনা আদায়ের জন্য তালুক চির বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। সেই থেকেই গৈলায় ৩৬০ ঘর তালুকদারের উত্থান হয়। এদের এক বংশধরের জামাতা মোহন দাস মুন্সি শিহিপাশায় সুরম্য অট্টালিকা নির্মাণ করেন। মুল ভবনের ছিল ১০১টি কক্ষ। বাড়ির মধ্যেই ফাঁসির মঞ্চ, অন্ধকার কোঠা ও সুরঙ্গ রাস্তা ছিল। ৮০ দশক পর্যন্ত ওই বাড়িটি দেখার জন্য উচ্ছুক মানুষের ভির জমত। জমিদারদের নানান কার্যকলাপ নিয়ে দর্শনার্থীরা আলোচনা সমলোচনা করতেন। ৮০ দশকের পর বাড়িটি ভেঙ্গে সেখানে গুচ্ছগ্রাম তৈরী করা হয়। এ বাড়িটির মত আগৈলঝাড়ার বেশ কয়েকটি বাড়ি ফেলে রেখে ১৯৫০ সালের দিকে অধিকাংশ হিন্দু জমিদার দেশ ছাড়েন। ১৯৫৬ সালের দিকে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের পর  ওই এলাকার সত্ত্বভোগী তালুকদাররা নিঃস্ব হয়ে পরেন। বাপ-দাদার বাড়ির ঐতিহ্য আর পূর্ব পুরুষের স্বর্ন যুগ নিয়ে চর্বিত-চর্বন করা ছাড়া কোন উপায় ছিল না। পূর্ব পুরুষের প্রতিষ্ঠা করা গৈলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, গৈলা বাজার ও গৈলা পোষ্ট অফিস নিয়ে তারা গর্ববোধ করতেন। এক সময় তাদের পূর্ব পুরুষেরা সেখানে একটি সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে তারা দাবী করতেন। কলকাতা থেকে ওই কলেজে শিক্ষা গ্রহনের জন্য শিক্ষার্থীরা আসতেন বলে জানা যায়। এখন ওই কলেজের কোন অস্থিত নেই। মধ্যশিহিপাশায় মেয়েদের শিক্ষার জন্য একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলেও তাও কালের বির্বতনে হারিয়ে যায়। আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা বাজারের উত্তর পার্শ্বে রয়েছে মধ্যযুগীয় কবি বিজয় দাস গুপ্তের বাড়ি। এ বাড়িতে মনসা মন্দির রয়েছে। কবি বিজয়  দাস গুপ্ত এ বাড়িতে বসেই মনসা মঙ্গল কাব্য  রচনা করতেন। ১শ বছর পর ২০০৫ সনে ওই বাড়িতে নতুন করে দেশের সর্ব বৃহৎ ১টন ওজনের পিতলের মনসা মূর্তি স্থাপন করা হয়। আগৈলঝাড়া জমিদার বাড়ি গুলোর সাথে সাথে বিলুপ্ত হয়ে গেছে অনেক ঐতিহ্যবাহী পুরানো মন্দির ও মূর্তি। প্রতœতত্ত্ব বিভাগের লোকজন একটু এগিয়ে আসলেই এগুলো সংরক্ষন করা সম্ভব হত। জমিদার বাড়ি সহ উপজেলার বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী গ্রামের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া জমিদার, মুন্সি বাড়ির বংশধর ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় তথ্য মন্ত্রী প্রিয় রঞ্জন দাস মুন্সি, মি. পরিতোষ চন্দ্র দাস (আমেরিকার নাসায় উচ্চ পদে কর্মরত), ড. অমিয় দাস গুপ্ত (প্রাক্তন শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যাল ও দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়), ড. অলোকানন্দ প্যাটেল (প্রফেসর অব লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিস্ক), ড. স্যার পার্থ সারতি দাস গুপ্ত (ক্যামব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডন), মি. জহর লাল দাস (আমেরিকার উচ্চপদে অসীন), মি. সুশীল অধিকারী (প্রাক্তন মন্ত্রী), শিক্ষানুরাগী ও প্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট ভারত ও প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী গৈলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা স্বর্গীয় কৈলাশ চন্দ্র সেন, উপজেলা সদরে অবস্থিত শিক্ষানুরাগী বিএইচপি একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা ভেগাই হালদার, শহীদ আঃ রব সেরনিয়াবাত (সাবেক মন্ত্রী), র্স্বগীয় বাবু সুনীল কুমার গুপ্ত (সাবেক মন্ত্রী) সহ আরোও অনেক নাম না জানা জ্ঞানী-গুনি ব্যক্তিরা এ উপজেলায় জন্ম গ্রহণ করেন।

পূণ্যশ্লোক মহাত্মা ভেগাই হালদার মহাশয়ের পূণ্য স্মৃতি বিজরিত কর্মক্ষেত্র আগৈলঝাড়া। এই পূণ্যভূমি বরিশাল জেলার অদূর উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে প্রত্যন্ত পল্লী অঞ্চলে অবস্থিত। এটা একটা নিতান্ত পল্লীগ্রাম। তবে “আগৈলঝাড়া” মূলত কোন এক গ্রাম নয়। এটা মানসী ফুল্লশ্রী গ্রামের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের কিছু অংশমাত্র। এর পূর্ব দিকে বাংলার সুবিখ্যাত গৈলা গ্রাম। মানসী ফুল্লশ্রী বহুকাল পূর্বে শিক্ষা, সংস্কৃতিতে অনুন্যত ঐতিহ্যবাহী গ্রাম। এই জনপদ “পন্ডিত নগর” নামে আখ্যায়িত। বিশেষতঃ সংস্কৃতি ভাষায় উ”” শিক্ষিত পন্ডিতগণের এটা ছিল প্রখ্যাত কেন্দ্র। এই পবিত্র ভূমিতে মধ্যযুগের কবি বিজয় গুপ্তের মতো লোক জন্ম গ্রহন করেণ। তখন বাংলা সাহিত্যের শৈশবকাল বা “মঙ্গল কাব্য” রচনার যুগ।

কথিত আছে বঙ্গ দেশের নব্বগণের শাসন কালে তাদের আদেশ ও অর্থ ব্যায়সাধারণ জনগনের বিশুদ্ধ জলের ব্যবস্থা ও তাদের কীর্তি সংস্থাপনের জন্য এই পল্লী গ্রামে অতি বৃহত কিছু দীঘি খনন করতেন। আগৈলঝাড়ায় এরূপ ৪ টি দীঘি বিদ্যমান। সেগুলো হরিদাসের পাড়, নরসিং সেনের পাড়, কুবতির পাড় ও ছবিখার পাড় নামে পরিচিত। দীঘি খননের পর কোদাল এবং আগৈল (ঝুড়ি) ওই সানে বসে শ্রমিকগণ কেড়ে পরিস্কার করছিল যার প্রেক্ষিতে মানসী ফল্লশ্রী ওই অংশের নাম হয় “আগৈলঝাড়া”। ঊনবিংশ শতাব্দির প্রথম দিকে সাধু জগন্নাথ নামে এক ব্যাক্তি গ্রামে বাস করতেন। জগন্নাথকে লোকে বুগল বলে ডাকতো। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সরল ও সৎ। ১২৬০ খ্রিঃ এর ২১ আষাঢ় সূর্য যখন পূর্ব আকাশে রক্তিম রঙে রঞ্জিত হয়ে উঠেছিল ঠিক তখনই জগন্নাথের স্ত্রী “সরল দেবী” একটি পুত্র সন্তান জন্ম দেন। সামাজিক প্রথা অনুযায়ী তার সুভ আগমন বার্তা ঘোষিত হলো জনৈক বৃদ্ধা লাঠিতে ভর দিয়ে শিশুটিকে দেখার জন্য আসেন এবং সহসাই বলে উঠেন “এক ভাগ্যই আইছে” উক্তিটি যথার্থই ছিল, কেননা হৃষ্ট-পুষ্ট হলেও শিশুটির গঠন নিটল ছিল না। পিতা জগন্নাথ এক মাত্র পুত্রের নাম রাখলেন “রাম নাথ” বাড়ির লোকেরাও ছোট বেলায় ভেগু ও ভেগাই বলে ডাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেলেন। পিতা জগন্নাথ তাকে পাঠশালায় যাওয়ার পূর্বমুহূর্তে তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যেতনা। সারাদিন পাড়ায়-পাড়ায় ঘুরে বেড়াতো ও মারামারি করতো। হৃষ্ট-পুষ্ট হওয়ার কারণে সমবয়সী কোন সঙ্গীরা তার সাথে গায়ের জোড়ে পেরে উঠতো না। তাই প্রতিবেশীদের নালিশের ভারে মায়ের বকুনী খেতো প্রতিনিয়ত। শাসন করতে গেলে শরৎচন্দ্রের গয়া রামের মতো বিশ্রী কান্ড বেঁধে ফেলতো। লেখাপড়ার অমনোযোগীর কারণে পিতা তাকে চাষাবাদের কাজে নিযুক্ত করলো। চাষাবাদে মনযোগী হওয়ায় অল্প দিনেই এই শিক্ষা তার করায়ত্ব হলো। শত চেষ্টার পরেও লেখাপড়া না করাতে পেরে চাষাবাদে মনযোগী হওয়ায় পিতা কিছুটা শান্তি খ্ুঁজে পেল। পূর্ণ যৌবনপ্রাপ্ত হওয়ার পূর্বেই ভেগাইকে বিবাহ দেওয়ার জন্য পিতা মনে মনে ইচ্ছা পোষন করেন। প্রসঙ্গত: সে সময়ে বাল্য বিবাহই প্রচলিত। চিরুনী কাটার ব্যবসা সুবাদে অনেক দূরবর্তী গ্রামে জগন্নাথের যাতায়াত ছিল। সেই সুবাদে আগৈলঝাড়া থেকে তিন মাইল উত্তরে “গোয়াইল” নামক গ্রামে নদী রাম জয়ধরের আট-নয় বছরের বয়স্ক মেয়ে “তারা মনি” কে দেখে পুত্রবধূ হিসাবে মনে মনে পোষন করেন।জগন্নাথের সুভ প্রস্তাবে নদী রাম  নববধুকে বরণ করলেন।

সংসার এবং জীবিকা নির্বাহ কাজে সহসাই ভেগাই আকৃষ্ট হয়ে উঠে। পিতা ভেবে বিস্মিত হলো যে, তার দূরন্ত ছেলে কৃষি কার্য এবং সংসার পরিচালনায় বিশেষ দক্ষ হয়ে উঠেছে। ভেগাই এখন পূর্ণ বয়স্ক যুবক। কোন কোন সময় তিনি এমন দৈহিক শক্তির পরিচয় দিতেন যে, অনেকে তাকে দৈত্য বলেও অভিহিত করতো। তার অদ্ভূত অনেক কাজের কথা এতদাঞ্চলের এখনো অনেক লোকের মুখে শোনা যায়। সম্পদ বৃদ্ধির আশায় ভেগাই সুদের ব্যবসা আরম্ভ করলেন, দরিদ্র অনেক কৃষক তার কাছ থেকে বা বার্ষিক সুদে ঋণ গ্রহন করতো। অতি কঠোরতার সাথে তিনি সুদাসল আদায় করতেন। পিতা জগন্নাথ সুদখোর পুত্রের ওই ব্যবসাটি আদৌ পছন্দ করতে না। তার বাল্যকালের দুরন্তপনা যৌবনে তীব্র আকার ধারন করলো। তার স্ত্রী তাকে যমদুতের মত ভয় করতো। অনেকের মুখে শোনা যায় তিনি স্ত্রীর উপর ভীষন অত্যাচার করতো। পুত্রের এ সমস্ত দুব্যবহারের বাউল ভাবধর্মী সাধু জগন্নাথ ক্রমান্বয়ে সংসারের প্রতি ভীতশ্রদ্ধ হতে লাগলেন। কালক্রমে ভেগাইর ঘরে তিনটি পুত্র, কন্যা জন্মগ্রহন করে। তিনটি শিশু আগমনে জগন্নাথের আনন্দের সীমা ছিলনা। বেশিদিন তার এই আনন্দ স্থায়ী হলো না, জ্যেষ্ঠ পুত্র অশ্বিনী কুমার ও কনিষ্ঠ পুত্র শ্রীদাম  এবং একমাত্র কন্যা সরযু বালা। তিনি যেমন লেখাপড়া করেননি তেমনি পুত্রদ্বয়কেও শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেননি। অশ্বিনী কোন নাম সই করতে পারতেননা।

একদিন বিকেলে ভেগাই ধান মড়াইয়ের জন্য চারটি বলদ এবং একটি আসন্ন পসরা গাভী জুরে দিলেন। কিছুক্ষণ ঘুরেই গাভীটি শুয়ে পড়ে এবং একটি সাবক প্রসব করে। আবার স্ত্রী তারা মনিকে কোন একটা কথা শোনার জন্য বার বার ডাকার পরেও তিনি শুনতে না পাওয়ায় গজাল লোহা গরম করে তারামনির শ্রবণ শক্তি বাড়ানোর জন্য কানের মধ্যে ঢুকিয়ে এফোর ওফোর করে দেন যার ফলে সাথে সাথেই তারামনি মৃত্যুবরণ করেন। এই দৃশ্যে সাধু জগন্নাথ অত্যন্ত মর্মাহত হন এবং তৎক্ষনাৎ নিজ গৃহ ত্যাগ করেন। শোনা যায়, পরবর্তী জীবনে তিনি তীর্থবাসী হয়ে সব দুঃখ দূর করেন। কোন দিন তিনি নিজ গৃহে ফিরে আসেননি। জগন্নাথের গৃহ ত্যাগের পর তার স্ত্রী সরলা দেবী মাত্র অল্প কিছু দিন জীবিত ছিলেন। পিতা নিরুদ্বেশ, মায়ের মৃত্যু। দুর্দান্ত ভেগাইর অন্তর শোকে দুঃখে বিব্বল হয়ে পরে, তার মানসিক অবস্থা তিনি প্রকাশ করতে পারলেন না। ঘরে, বাহিরে, মাঠে কোথাও তার শান্তি নেই। স্ত্রী ছেলে-মেয়ে সবার প্রতি তার সংসারিক বন্ধন ছিন্ন হতে চলছে। ভেগাই শুধু ভাবছে তার পিতাকে তিনি কোন দিন সুখ শান্তি দিতে পরেন নি, বরং প্রতিনিয়ত কেবল দুঃখ কষ্টই দিয়েছেন । তার ছেলেরা কি কোন দিন তাকে সুখী করবে? অফুরন্ত তার মাথা ভরা চিন্তা, মর্মঘাতী জ্বালা! মাঠে, ঘাটে, বাটে তার বহু দিন কাটে। কৃষিকর্ম এবং গৃহকর্ম কোনটাই তিনি করেন না। উপর্যন হীনতায় সংসার তার নিদারুন অভাব অনাটন দেখা দিল। পাপ-তাপ প্রপ্রীড়িত ভেগাই। কৃতকর্মের অনুসূচনায় অশ্র“ধারায় বিগলিত ভেগাই। অন্তরে তার মুক্তি চায়। কোথায় মুক্তি? কোথায় পথ? কে দেবে উত্তর? পথ আছে, মুক্তি আছে। মানুষ যখন কৃতকর্মের জন্য সত্যিকার অনুসুচনা করে এবং অন্তরের অন্তস্থল থেকে মুক্তি কামনায় ব্যাকুল তখন মুক্তর পথ তার সন্মুখে।

বরিশালের অবিসংবাদিত জন নায়ক মহাপ্রাণ অশ্বিনী কুমার দত্ত ওই সময় মানসী ফুল্লশ্রী তে একটি ধর্মী সভায় যোগ দেন। ভেগাই ওই অনুষ্ঠানেই অশ্বিনী কুমারের দর্শন লাভ করেন। অস্থির চিত্তে ভেগাই গভীর মনোযোগ সহকারে অশ্বিনী কুমারের অমৃত ধারাবর্ষী বাণী শুনলেন। প্রতিটি কথাই তার হৃদয়কে আন্দোলিত করলো। তার মন বিগলিত হলো। মহাত্মা অশ্বিনী উপস্থিত জনগনের সমাজজীবনে, ধর্মীয় অনুশাসন এবং স্বাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্তির আলোচনা সবার মন জয় করলেন। বিগলিত, মহাত্মারা ভেগাই অশ্বিনী কুমারের কাছে তার সমস্ত জীবনের করুন ইতিহাস বললেন। অশ্বিনী কুমার তার হৃদয়ের কথা বুঝতে পারলেন। তিন কিছু দিন পরে তার বরিশালের বাসায় ভেগাইকে সাক্ষাৎ করতে বললেন।

অশ্বিনী কুমারের সাথে সাক্ষাতের পর ভেগাই মানসী ফুল্লশ্রী জনৈক তালুকদারকে সাথে নিয়ে শিক্ষাবিদ কৈলাশ চন্দ্র সেনের কাছে উপস্থিত হলেন। কৈলাশ সেনও এই এলাকার লোক। সেন পরিবারের তৎকালীন বরিশাল জেলার সর্বত্র উচ্চ শিক্ষিত, সন্মানীত বলে সুপরিচিত ছিলেন। সমগ্র উত্তর বরিশালে প্রত্যন্ত পল্লী অঞ্চলে সর্বপ্রথম কৈলাশ চন্দ্র সেন ১৮৯৩ খ্রিঃ গৈলা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওই সময় গৈলা স্কুলের একটি বিশেষ ভূমিকা রাখেন।

দুর্দান্ত দুদ্ধপোষ্য শিশু যেমন অস্থির কান্নার পর মায়ের স্তন্য পানে শান্ত হয়, ঠিক ভেগাইও কৈলাশ চন্দ্রের কথা শুনে পরিতৃপ্ত লাভ করলেন। ভেগাই বললেন “আমি অশিক্ষিত মুর্খ মানুষ, টাকা পয়সাও নেইযে আমি জাতির জন্য কিছু করতে পারি” কৈলাশ বললেন, ‘ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়’। তোমার শক্তি ও সম্পদ যাই আছে মহৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করলে তাতে সহযোগিতার কোন অভাব হয় না। সেদিন থেকে কর্মের মূলমন্ত্র হলো-অন্ধকে চক্ষু দান করা। কিছু দিনের মধ্যেই ভেগাই পিতৃ দর্শনের জন্য তীর্থ যাত্রার জন্য প্রস্তুত হলো। অনেক কষ্টের পরে ভূ-স্বামী তালুকদার দাসগুপ্ত তাকে তীর্থযত্রার অনুমতি দেন। একদিন শুভক্ষনে পিতৃ দর্শনের জন্য ভেগাই তীর্থে বেরিয়ে পড়লেন। গয়া, কাশি, বৃন্দাবনসহ বিভিন্ন তীর্থ দর্শন এবং মায়ের আত্মার সদগতির জন্য গয়ায় পিন্ডদান করলেন। তীর্থ ক্ষেত্রে প্রসাদ লাভের পরেও তিনি ভাবছেন ‘কতো হেরিলাম মনোহর দৃশ্য , কিন্ত তবু ভরলো না চিত্ত’। কারন এখনো তিনি পিতার দর্শন পাননি। পিতৃ দর্শন না পেয়ে ভারাক্রান্ত হৃদয় নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। বর্তমানে আগৈলঝাড়া হাটে তার কিছু রেকর্ডীয় জায়গা ছিল। তিনি তার উপর খরের ঘড় নির্মান করে তাতেই বাস করতে লাগলেন। তিনি আর কোন পিতৃগৃহে ফিরে যাননি। পুত্রদ্বয় প্রতিদিন বাড়ি থেকে খাবার সরবরাহ করতো। তপস্বীর ন্যায় ভেগাই জীবন-জাপন করতে লাগলেন। এরপর ওরাকান্দি তীর্থ ভ্রমনের সময় শ্রী শ্রী গুরু চাঁদ ঠাকুরের কাছে তার রূপ সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়। যৌবনে দুরন্তপনা যাকে সব সময় ঘিরে থাকতো আজ সেই ঈশ্বরের নামে থাকে সর্বদা উদাস।

কথিত আছে ভেগাই হরি নাম কীর্তন ও শ্রবণের একটি অভিনব পন্থা খুঁজে বের করলেন। ভেগাই রাস্তায়, হাটে, মাঠে ও গ্রামে উচ্চস্বরে বলতেন, তোরা হরি নাম করিসনা বাতাসা দিমু’ বলা বাহুল্য ছেলেমেয়েদের যা বারন করা হয় তাই তারা বেশি বেশি করে। ভেগাইকে ক্ষ্যাপানোর জন্য ছেলেমেয়েরা ‘হরি বোল, হরি বোল, ধ্বনি করতো। আর তিনি বাতাসা ছিটাইতেন। এই অভূতপূর্ব বিষয়টি এখনো অমর করে রেখেছেন।

১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের শাসনআমলে বঙ্গদেশে দ্বি-খন্ডিত করে বঙ্গদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ নামে পৃথক প্রদেশ পরিনত করে। মহাত্মা ভেগাই জানতে পারলেন তার গুরু হরিচাঁদ ঠাকুর এবং বরিশালের অবিসংবাদিত নেতা অশ্বিনী কুমার দত্ত আন্দোলনে আত্মো নিয়োগ করছেন। ভেগাই ও আন্দোলনে জরিয়ে পড়লেন। ভেগাইর মুখে আগৈলঝাড়ার একটি ক্ষুদ্র পাঠশালা স্থাপিত হয়েছে শুনে অশ্বিনী কুমার তাকে সাধুবাদ জানালেন এবং এটা যে একদিন বিরাট রূপ ধারন করবে তাও প্রকাশ করলেন। অশ্বিনী কুমার ভেগাইকে বললেন “আজ থেকে তুমি আমার মিতা”। ভেগাই জিজ্ঞেস  করেন ‘তা ক্যামনে হয়’? অশ্বিনী কুমার উত্তর দিয়েছিলেন তুমি ভেগাই আর আমি চেগাই’ বলা প্রয়োজন অশ্বিনী কুমার- এর পরে সব পত্রেই ব্যবহার করতেন ‘ ইতি তোমার চেগাই’।

পূর্বেই যে পাঠশালাটি ভেগাই স্থাপিত করেছিল তার দায়িত্বে ছিলেন হর ভূষন হালদার (পন্ডিত মশাই) কালক্রমে বিদ্যালয়টি বড় করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলো। সার্বিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন, নিবারন চন্দ্র দাস, নিশিকান্ত মিস্ত্রি, সীতানাথ হালদার, গোপাল হালদার, মফিজউদ্দিন খান, মুন্সি দলিলউদ্দিন পাইক, ধোনাই ফকির প্রমুখ। ব্রিটিশ কলকাতায়ও স্কুলের জন্য চাঁদা সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং তার দায়িত্বে ছিলেন ভেগাই নিজেই। কলকাতার এক পুস্তক বিক্রেতার নিদর্শন পাওয়া যায়। বর্তমান আগৈলঝাড়া নামে খ্যাত জায়গা পূর্বে গাছপালা এবং জঙ্গল ছিল পরিপূর্ণ এই স্থানটির মালিক ছিলেন রনাম চরন বাড়ৈ। ভেগাই রাম চরণের চাইলেন রাম চরন ভাইদের সাথে আলাপ করে বর্তমান বিএইচপি একাডেমির সম্পূর্ণ জায়গা দান করেন । উল্লেখ্য আগৈলঝাড়ায় যে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত তার অধিকাংশ জমি রাম চরণ বাড়ৈ ও তার বংশধররা দান করেন, কিছু অংশ দান করেন দীন বন্ধু হালদার। তাই ভেগাই নামের রামচরন বাড়ৈ নামটিও আগৈলঝাড়ায় চির- অম্লান। ভেগাই সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলেন । ভেগাই নিজ উদ্যোগে আগৈলঝাড়ায় রায়ত কনফারেন্স করেন। সে কনফরেন্সে উপস্থিত ছিলেন দেশ বরণ্য অশ্বিনী দত্ত, আশ্চার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক সহ বহু উচ্চপদস্ত নেতৃবৃন্দ। এই সভায় ভারতের বিখ্যাত পন্ডিত ভারতীয় কংগ্রেস নেতা মদন মোহন মালব্য এবং বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথের বোনের মেয়ে প্রখ্যাত সমাজ সেবিকা সরলা আসেন। হিন্দু সভার নেতা পদ্মরাজ জৈন এবং কংগ্রেস কর্মী সরোজিনী নাইন্ডু কলকাতা থেকে যখন গৌরনদীতে এসে পৌছেন তখন ভেগাই ও যোগেন্দ্র নাথ মন্ডল অনেক কৃষক কর্মী নিয়ে তাদের  সম্মেলনে  না আসার জন্য অনুরোধ জানান। কারন তাদের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্নরূপ। এই কনফারেন্সে ‘ভেগাই হালদার কনফারেন্স’ নামে জনশ্র“তি রয়েছে। তৎকালীন আনন্দ বাজার, অমৃত বাজার নামে কলকাতার পত্রিকায় এই কনফারেন্স বিশেষ স্থান পেয়েছিল। যার মাধ্যমে সমগ্র দেশে ভেগাই নামটি উজ্জ্বল হয়ে বিস্তৃত লাভ করে।

সরকারের সামান্য সহযোগীতায় এই স্তম্ভটি প্রাণ ফিরে পেতে পারে এবং আগৈলঝাড়ায় দীর্ঘ দিনের ইতিহাস এতদাঅঞ্চলসহ সমগ্র বাংলাদেশের মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারে। শত বাধা উপেক্ষা করে যে অবকাঠামোটি আজ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে তাও সবার চোখে অস্পৃহাই রয়েছে।